পিউর সিংগেল | জুবায়ের আল মাহমুদ

মুক্তার আমার খুবই কাছের বন্ধু। প্রথম যখন তার সাথে দেখা হয় দেখেই মনে হয়েছিলো, ছেলেটা বেশ হাবাগোবা মদন টাইপের। তখন সে মেয়েদের আশেপাশে যায় না। কিছুদিনের মধ্যে যে এতো বড় প্রেমিক পুরুষ হয়ে উঠবে আমি ভাবতে পারিনি।

ওর সব কিছুই ভাল্লাগে শুধু একটা জিনিস ছাড়া। কিছুদিন পর পর নিজেকে পিউর সিংগেল দাবি করে। কিছুদিন পরপর দাবি করে কারণ, কিছুদিন প্রেম করে তারপর ব্রেকাপ করে বা ছ্যাঁকা খায়। ছ্যাঁকা খেয়ে বেশ কিছুদিন দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তারপর সব ভুলে আবার সে পিউর সিংগেল।

সেদিন বন্ধু কলেজ এক সুন্দরী মেয়ে দেখে ফিদা হয়ে যায়। তার সাথে প্রেম করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। আমি শুধু তার কান্ডকারখানা দেখছিলাম। কতোই না কলাকৌশল প্রদর্শন করলো মেয়েটাকে পটাতে। মেয়ের বাসা পর্যন্ত যায়। প্রাইভেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে৷ কলেজ ছুটির সময় কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। রোজ ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল নিয়ে সামনে যায়। মাঝে মধ্যে বাচ্চা ছেলেদের দিয়ে ফুল পাঠায়। আমি অবাক হই। একট মানুষ কেমনে পারে একটা মেয়ের জন্য এতোসব করতে! মুক্তারকে জিজ্ঞেস করলে সে একটা কথাই বলে, তোর মতো গর্দভের মাথায় প্রেম ঢুকবে না।

আমিও প্রেম থেকে দূরে থাকি। যখন ওর মাথায় প্রেম নামক ভূত ঘুরেবেড়ায় তখন ওর থেকেও দূরে থাকি। জানি পিউর সিংগেল হয়ে আবার ফিরে আসবে আমার কাছে৷

মেয়েটা মুক্তারের প্রতি ইম্প্রেস হয়ে গেলো অল্প ক’দিনেই। জমিয়ে প্রেম চলছে তাদের। প্রেমিকা আমাকে তো মুক্তার ভুলেই গেছে।

ওর আগের প্রেমিকার নাম মালতী। মেয়েটি অদ্ভুত এক কারণে মুক্তারকে ছ্যাঁকা দিয়ে চলে গেলো। ঘটনা কার কাছে কেমন তা জানি না, তবে আমার কাছে খুবই অদ্ভুত লেগেছে।

প্রতিদিনই তারা দু’জনে ফুসকা খেতে যেতো। একদিন মুক্তার ফুসকার বদলে অন্য কিছু খেতে চেয়েছিলো। এজন্য মালতী অভিমান করে বসে। ক্ষীণ কণ্ঠে মুক্তার ফুসকার নামে একটা গালি দেয়।এই গালি দেওয়াটা আবার মালতী শুনে ফেলে। তারপর আর কি! মালতী বলে,“মুকু!তুমি আমার ফুসকাকে গালি দিলা কেন? ফুসকার নামে বাজে কথা বললা কেন? যাও ব্রেকাপ। আর যোগাযোগ করবা না।”

মুক্তার এতোটাই কষ্ট পেয়েছিলো যে এই শীতের দিনে ফ্রিজের পানি দিয়ে গোসল করে আত্নহত্যা করতে চেয়েছিলো। আমি সান্ত্বনা হিসেবে বলেছিলাম,“দেখিস ক’দিন পর আরেকটা নতুন গফ আসবে। একটা গেলে আরেকটা পাবি। আরো ভালো কিছু পাবি।”

মুক্তারের প্রথম প্রেমিকার নাম ছিল সাদিয়া। বিস্তারিত বললে একটা বড় উপন্যাস হয়ে যাবে তাই শুধু ব্রেকাপ হওয়ার ঘটনা বলছি।

একদিন মুক্তার হঠাৎ করে তার বাসায় যেতে বললো। বাসায় কেউই নাই ইমার্জেন্সি ভাবে এখনই যেতে হবে। ওর নাকি জীবন মরন অবস্থা হয়ে আছে। দৌড়ে গেলাম মুক্তারের বাসায়।

দরজা, জানালা খোলা অনুমতি ছাড়া ভিতরে প্রবেশ করা ঠিক হবে না। বাসার বাইরে দাঁড়িয়েই কল দিলাম।
–দোস্তো তোর বাসায় আসছি। কই তুই?
–আমি কই ওইসব পরে জিজ্ঞেস কর। আগে একটা কাজ কর।
–বল।
–সিড়ির নিচে মটরের সুইচ আছে মটর অন কর। টয়লেটে পানি নাই।

আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না মহাশয় টয়লেটে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছে। আমি মটর অন করে রুমে গিয়ে বসলাম। দশ মিনিট পরে মুক্তার বেরিয়ে এলো। অজু করে এসেছে গামছা দিয়ে মুখ মুছলো। তখনই খেয়াল করলাম ওর চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। চোখ ছলছল করছে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো।

–দোস্ত আমার ব্রেকাপ হইছে। আমি কি এমন করছি যে আমাকে ছেড়ে চলে গেলো! সাদিয়া আর আমার নাই। -বাচ্চাদের মতো কেঁদে কেঁদে কথা গুলো বললো মুক্তার।

সব আমার মাথার উপ্রে দিয়ে গেলো। একটু আগে টয়লেটে পানির অভাবে বন্দী ছিলো। এখন বলতেছে ছ্যাঁকা খাইছে।
আমি বললাম,“সব ক্লিয়ার কইরা ক কি হইছে!”

–সাদিয়ার সাথে অনেকক্ষণ ধরে চ্যাটিং হচ্ছিলো। আমি বললাম, আমার তাকে চুমু দিতে ইচ্ছে করছে। দিলামও তাকে একটা চুমু। তারপর তাকে বললাম আমাকে একটা চুমু দাও। সে জিজ্ঞেস করলো আমি কোথায় আছি। আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম কখনো মিথ্যা বলবো না তাই বললাম, আমি টয়লেটে আছি বাবু, বড় কাজ করতেছি……

এটুকু বলে আবার হাউমাউ করে কাঁদছে। ইন্টার পরীক্ষায় ফেল করেও কেউ এভাবে কান্না করে না৷

–তারপর?

মুক্তার চোখের পানি মুছে বললো,“ সাদিয়া বললো, ছিহ্ এতো পঁচা তুমি? বাথরুমে গিয়ে আমার কাছে চুমু চাও? যাও ব্রেকাপ। আমার পিছনে তোমার মতো আতেলের লাইন লেগে আছে। আমি তাদের রেখে কি জন্য যে তোমাকে পছন্দ করছিলাম আল্লাহ ভালো জানেন। আর যোগাযোগ যাতে না করি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে।

বলেই আমার কাধে মাথা রেখে কান্না শুরু করলো। আমি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলাম,“দোস্ত কান্দিস না। কান্দিস না আতাল…। আতাল বলেই জিহ্বায় কামোড় দিয়েছিলাম। ভাগ্যিস মুক্তার শোনতে পায়নি। প্রথম ছ্যাঁকার দুঃখ তিন মাস ছিলো। তারপর আর কি! পিউর সিংগেল হয়ে গেলো। তখন থেকে ওর পিউর সিংগেল জ্বালা সহ্য করতেছি।



এবার যে মেয়েটার সাথে প্রেম করতেছে তার নাম মিরা। বলতে হবে এই মেয়েটাকে পটাইতে খুব পরিশ্রম করতে হয়েছে। মনে হচ্ছে বিয়ে লপর্যন্ত চলে যাবে।

ছ’মাস কেটে গেলো। আমার সাথে মুটামুটি রকমের যোগাযোগ আছে।

হঠাৎ একদিন দেখলাম মুক্তার উদাসী হয়ে কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে আছে।

–কি রে দোস্ত! কি হইছে তোর? -জিজ্ঞেস করলাম আমি।
–আর কইস না দোস্ত! জীবনডা শেষ হইয়া গেছে৷ জীবনে কোন সুখ নাই রে! – উদাসীন হয়েই উত্তর দিলো মুক্তার৷

–কেন কি হইছে?
–আর কইস না ভাই। এতো এতো আইন ছুড়ে মারছে আমার দিকে।

–কেমন আইন?
–কোন মেয়ের সাথে কথা বলা যাবো না। চ্যাটিং করা যাবো না। কোন মেয়ের দিকে তাকানো যাবো না। কোন মেয়ের প্রফাল পিক পর্যন্ত দেখা যাবে না এমনকি তাতে লাভ রিয়েক্টও দেওয়া যাবে না। বল তুই এগ্লা কোন আইন হইলো?

–আহারে! তোর জন্য তো খুবই দুঃখজনক। তা মানলি কিভাবে?
–মানতে আর কই পারলাম! ভুলকরে আমার এক্স গফ মানে মালতীর পিকে লাভ রিয়েক্ট দিয়ে দিছি। মিরা ভাবতেছে মালতীর সাথে আবার প্রেম শুরু করছি ৷ বল তুই এগ্লা সহ্য করা যায়? তারপর দেখা করতে বললাম, দেখা । সে দেখা করতে এলো। আমি যতো গিফট দিয়েছিলাম সব আমার মুখের উপর ছুড়ে দিয়ে চলে গেলো।

–তো এখন কি করবি? মানে কি করতেছস?
মুক্তার এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
–কালকে থেকে গফ নাই সিংগেল হয়ে ঘুরতেছি। কলেজে আসলাম যদি জুনিয়র কাউরে পছন্দ হয়!

(সমাপ্ত)

🔥30 view

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *