ফাহমিদা সুলতানার লেখা “প্রাক্তন”

শেষ বিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল। দুপুরের পর থেকেই আকাশ মেঘলা, মাঝে মাঝে মেঘেরা উড়ে যাচ্ছে আকাশ ছোঁয়া বাড়ি গুলোর মাথা মুড়িয়ে। বাতাস আর্দ্র কিন্তু বৃষ্টিটাই যা হচ্ছিল না।

জানালা খুললে অনেকটা দূর দেখা যায়। অরনী চুপচাপ বসে ছিলো। এরকম মেঘের দুপুর কিংবা বিকেলে মন কেমন বিষন্ন হয়ে যায়, খুব আলস্য লাগে তখন। চোখ বন্ধ করলেই সেই কলেজ জীবনের স্মৃতি গুলো মনে পড়ে। অরনী বরাবরই শান্ত স্বভাবের ছিলো। নিজের থেকে কারো সাথে মিশতে গেলেই দ্বিধায় পড়ে যায়।

ক্লাস শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই তাসনিম নামের ১জনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। তাসনিম ঠিক অরনীর স্বভাবের উল্টো। সারাক্ষণ ওর মনে ছেলে বিষয়ক কথা। অরনী এতো বছরেও যা জানতোনা, ওর সাথে মিশে এখন অনেক কিছুই জানে।

অরনী পড়ালেখায় ভালো ছাত্রী হওয়াতে, ক্লাসের শিক্ষকদের নজরে পড়তে বেশি সময় লাগে নি। ওদের ক্লাসের এক ছেলে ছিল নাম অরুপ। সারক্ষন ক্লাসে হই হল্লা করে বেড়ানো ছাড়া, পড়ালেখার ধারেকাছেও যেতো না।

অরুপের এই কাজ গুলো তাসনিমের অনেক পছন্দ হলেও অরণীর অপছন্দ। সারাক্ষণি তাসনিমের মুখে অরুপের নাম। অরুপ এতটা সুদর্শন না হলেও সারাক্ষণ সবাইকে মাতিয়ে রাখা স্বভাবের কারণে অনেকের পছন্দ হয়ে উঠেছে।
তাসনিমের কারণেই অরনী,অরুপ এই তিনজনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। প্রায়ই কলেজ ছুটির পর ৩জন নদীর পাড়,বিভিন্ন পার্ক, রেস্টুরেন্ট চষে বেড়াতো।

কয়েক মাস পর অরনী বুঝতে পারলো, অরুপের প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কয়েক বার বলতে গিয়েও নিজের স্বভাবের কারণে বলতে পারেনি। অরুপের মাঝেও তেমন কিছু টের পায়নি। তাসনিমকে ব্যাপারটা জানানোর পর ও বললো বলে দিতে। কিন্তু অরুপ না করে দিলে সেটা সহ্য করা যাবেনা ভেবে আর বলা হয়নি।

এক মেঘলা দিনে ক্লাস শেষে অরুপ বললো নদীর পাড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। তাসনিম, বাড়িতে কাজ আছে বলে চলে গেলো। যাওয়ার আগে অরনীকে ইশারা দিয়ে গেলো।
২জন নদীর পাড়ে হাটঁছে, মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। অরুপ গল্প করেই যাচ্ছে। অরনী বরাবরের মতোই নিরব স্রোতা।

হঠাৎ বাজ পড়লো চমকে উঠে পিছনে দেখে ফয়সাল ২টা কফির মগ হাতে দাঁড়ানো। “কি ব্যাপার অরু? এতক্ষন ধরে তোমাকে ডাকছি কোন খেয়াল নাই তোমার, কি এতো ভাবছিলে?”
অরনী- “না তেমন কিছুনা। তুমি কখন এলে?”
ফয়সাল- “এসেছি অনেক্ক্ষণ আগে। আচ্ছা,আকাশ একটু মেঘলা হলেই তুমি কেমন যেন হয়ে যাও, আমাকে কি বলা যায় না?”

“কিছুনা এমনি” বলে অরনী রুমের দিকে পা বাড়ালো। ফয়সাল পিছন থেকে ডেকে যাচ্ছে “কই যাও কফিটা তো খেয়ে যাবে “
অরনী রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। চোখের পানি বাঁধ মানছেইনা। সেদিনের মেঘলা দুপুরের স্মৃতি গুলো এই ২বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে আরো কত দিন বয়ে বেড়াবে কে জানে, হয়তো মৃত্যু অবধি।

🔥19 view

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *